পৃথিবীর এক ভয়ঙ্কর নরক।যেখানে জীবিত মানুষদের কাটাছেড়া করা হতো।

    0
    26

    ক্যাম্প–২২ – এটি পৃথিবীতে বিদ্যমান এক নরক, যেখানে কেউ একবার প্রবেশ করলে আর বের হতে পারতোনা। যেখানে মানুষকে মানুষের চোখে দেখা হতো না, যেখানে মানুষকে ব্যবহার করে ভয়াবহ সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো হতো, যেখানে প্রসূতি নারীদের সরাসরি পেট কেটে ভ্রূণ বের করে ফেলা হতো, কখনো বা বড় তক্তা দিয়ে পিষে পিষে গর্ভপাত করানো হতো ৮-৯ মাসে প্রসূতিকে! যেখানে অভুক্ত শিশুরা এক কণা খাদ্যের জন্য প্রহরীর লাথি খেয়ে পচা ডোবায় পড়ে মরে, যেখানে নারীদের নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও নির্যাতন করে মেরে ফেলে হতো।

    স্যাটেলাইটে তোলা ছবি – ক্যাম্প ২২

    উত্তর কোরিয়ার Haengyong Concentration Camp-কে ক্যাম্প ২২ বলা হয়। এখানে সেসব মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয় যারা রাজনৈতিক সমালোচনা বা রাজনৈতিকঅপরাধী। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে উত্তর কোরিয়ার Great Leaderদের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা বা রাষ্ট্রদ্রোহিতা করলেই অপরাধী নিজে তো জেলখানায় যাবেই, তার সাথে সাথে তার ৩ প্রজন্মকেও জেলখানায় পচতে হতো, এমনকি জেলখানায় জন্মানো শিশুটিও নিস্তার পেত না!

    উত্তর কোরিয়ার উত্তর পূর্ব সীমান্তে হোয়ের ইয়ং কাউন্টিতে ২২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই নরকের অবস্থান। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা এই ক্যাম্প ১০ ফুট চওড়া ৩,৩০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক বেড়া দিয়ে আবৃত। কঠোর নিরাপত্তা এবং ক্যাম্প পরিচালনার জন্য প্রায় ১,০০০ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং প্রশিক্ষিত কুকুরসমেত পাহারাদার এবং ৫০০৬০০ কর্মকর্তা রয়েছে। কিছু দূর পর পর ল্যান্ড মাইন এবং মানুষ মারার গোপন ফাঁদ রয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার নারী পুরুষ ও শিশুবন্দী ছিল বলে জানা যায়। এরকম ভয়াবহ নরক উত্তর কোরিয়ায় আরো রয়েছে। এসব ক্যাম্পের বন্দীদের দিয়ে চাষবাস থেকে শুরু করে কারখানার কাজও করানো হয়। উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে এই ক্যাম্পগুলোর শিল্পোৎপাদন।

    পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে- এত কঠোর নিরাপত্তার পরও বহির্বিশ্বের মানুষ কীভাবে এই ক্যাম্পগুলোর অস্তিত্ব এবং এর কর্মকাণ্ড কীভাবে জানতে পেরেছে? চলুন জেনে নেই সেই সব মানুষের কাছ থেকে যারা এক সময় এই ক্যাম্পে কর্মী হিসেবে ছিলেন এবং কেউবা পালিয়ে এসেছেন সেই নরক থেকে।

    উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক Kim Il Sung এবং Kim Jong Il তাদের বিরোধীদের দমনের জন্য এই ক্যাম্প তৈরি করেছেন। বহির্বিশ্ব এবং দেশের মানুষের অগোচরে নিরিবিলি সব জায়গায় তৈরি করেছেন এসব জেলখানা যেখানে হতভাগা অপরাধীকে পরিবার এবং বংশসহ নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বর্বরতার নজির খুব কম। কিন্তু সেই কঠোর নিরাপত্তাকে খুব সহজেই ভেদ করেছে স্যাটেলাইট। চলুন দেখে নেই স্যাটেলাইটের তোলা কিছু ছবি।

    স্যাটেলাইট থেকে তোলা ক্যাম্প ২২এর একটি; Source: Businessinsider

    ডেভিড হক নামক এক মানবাধিকার গবেষক ক্যাম্প ২২ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। তিনি ক্যাম্পের কিছু প্রাক্তন পাহারাদার এবং পালিয়ে আসা বন্দিদের কাছ থেকে বেশ কিছু সাক্ষাৎকার নেন। ম্যাং চল নামক এক প্রহরী গুগল আর্থের তোলা ছবিগুলো দেখে প্রত্যেকটি ভবন এবং সেসব ভবনের কাজ কর্ম থেকে শুরু করে কী ধরণের নির্যাতন করা হতো সব কিছুর বর্ণনা দেন।

    ডিটেনশন সেন্টার দেখিয়ে বলেন,

    “কেউ যদি একবার এখানে ঢোকে, তবে তিন মাসের মাঝে মারা যাবেই। আর না মারা গেলেও সারা জীবনের জন্য অথর্ব হয়ে যাবে।”

    কাজে গাফলতি কিংবা সারাদিনের বরাদ্দ কাজ যদি কোনো বন্দী শেষ করতে না পারে, তবে প্রথমবারের জন্য তার খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। একই কাজ যদি সে তৃতীয়বার করে, তবে তাকে সরাসরি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর ডিটেনশন সেন্টার মানেই সাক্ষাত মৃত্যু।

    কিম ২ সাং ইন্সটিটিউট দেখিয়ে তিনি বলেন,

    “এটা অফিসারদের সিনেমা হল এবং পাশেই গার্ড ট্রেনিং সেন্টার।” একটি ময়লা ফেলার পচা ডোবা দেখিয়ে বলেন, “এই পচা পুকুরে ২টি শিশুর মৃত্যু হয় গার্ডের লাথিতে কারণ তারা ছোট্ট এক টুকরা নুডুলস নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিলো।”

    এভাবে ডোবায় ফেলে গণ কবর দিতো

    এখানে গার্ডদের ট্রেনিং এর সময় বলা হতো, ক্যাম্পের বন্দীরা মানুষ নয়, তাদের সাথে কুকুর বিড়ালের মতো আচরণ করতে হবে। আর গার্ড চাইলেই যেকোনো বন্দীকে যখন খুশি মেরে ফেলতে পারবে। এ ব্যাপারে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। কখনো কখনো এমন হয়েছে, কোন বন্দীকে তলবের পর তার আসতে খানিক দেরি হয়েছে বা দুর্বলতার ধীর পায়ে হেঁটে এসেছে, এই অপরাধের জন্য গার্ড সেই বন্দীকে মেরে ফেলেছে।

    ক্যাম্পের বন্দীদের কাছে মৃত্যু খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কারণ প্রতিদিন কেউ না কেউ চোখের সামনে মারা যায়। তবে মৃতদের মাঝে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। হতভাগা শিশুদের বাবা মাও জানতে পারে না কখন কোথায় তাদের আদরের সন্তানটি মারা গেছে। সেখানে মরাকান্নাও নিষিদ্ধ। ম্যাং চলের ভাষ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ এর অধিক বন্দী মারা যায়। কখনো গার্ডের হাতে, কখনোবা অতি পুষ্টিহীনতায় কিংবা নির্যাতনের কারণে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here